চা-বাগানের তেতো সত্য আর দুধ-চিনি মেশানো মিষ্টি গল্প
· Prothom Alo

১৪৩৩ সন শুরু হওয়ার আগেই বাংলা নববর্ষের উপহার নিয়ে হাজির চরকি। ‘গুটি’ আর ‘প্রিয় মালতী’ দিয়ে এরই মধ্যে মনোযোগ কেড়েছেন পরিচালক শঙ্খ দাশগুপ্ত। চা-বাগানের প্রেক্ষাপটে বানানো তাঁর ওয়েব ফিল্ম ‘চা গরম’ ট্রেলার পর্বেই আশা জাগিয়েছিল। শুধু ভেবেছিলাম, ‘চা গরম’ হয়তো চা–বাগানের মানুষের জীবনের নানামুখী সংগ্রামের অবিরাম-অবিরাম ভারের গল্প। কিন্তু ‘বাগান–বন্ধনের’ দৌড় দিয়ে যে গল্পের শুরু, তা যাবতীয় ভার বহন করেও হালকা পায়ে পরিণতির দিকে ছুটল। ‘চা গরম’ বাঙালির চায়ের মতোই—খানিক তেতো সত্যের গুঁড়া আর অনেকখানি মমতা-আশার দুধ-চিনি মেশানো।
সিনেমার শুরুর দিকেই টুকরা টুকরা দৃশ্যে চা-বাগানে কীভাবে চা প্রক্রিয়াজাত করা হয়, তা দেখা গেল। বরকত হোসাইন পুরো সিনেমাতেই ভালো ক্যামেরার কাজ দেখিয়েছেন, কিন্তু এই অংশটির কথা বিশেষভাবে মনে থাকবে। মূল গল্প শুরু হলো ডাক্তার আইরিনের ট্রেনযাত্রায়—ডাক্তারদের নিত্যকার বিড়ম্বনার ভেতর। এই দৃশ্যগুলো বোধ হয় সত্যিকারের ট্রেনে চলন্ত অবস্থায় শুট করা, একেবারে বাস্তব লাগে। শিল্প নির্দেশনায় নাঈমা জামান খেটে কাজ করেছেন, বোঝা যায়।
Visit syntagm.co.za for more information.
পৌনে দুই ঘণ্টার সিনেমাকে মোটেই দীর্ঘ মনে হয়নি। চা-বাগানের মানুষের দুঃখ-দুর্দশার নানা দিক গল্পের চরিত্রগুলোর রোজকার কথা, আচরণ-অভ্যাসে ফুটে উঠেছে, কিন্তু দারিদ্র্য বা বৈষম্যের রগরগে প্রদর্শনী শিল্পের সম্মান ক্ষুণ্ন করেনি।‘চা গরম’ সিনেমায় পার্থ শেখ। চরকির সৌজন্যে
চা-বাগানে আধা-অনিচ্ছুক এক ডাক্তার চিকিৎসাসেবা দিতে এসে কীভাবে সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের জীবন, আশা-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে জড়িয়ে পড়লেন—এমন বিষয়ে সাইফুল্লাহ রিয়াদ খুব আন্তরিক এক চিত্রনাট্য লিখেছেন। পৌনে দুই ঘণ্টার সিনেমাকে মোটেই দীর্ঘ মনে হয়নি। চা-বাগানের মানুষের দুঃখ-দুর্দশার নানা দিক গল্পের চরিত্রগুলোর রোজকার কথা, আচরণ-অভ্যাসে ফুটে উঠেছে, কিন্তু দারিদ্র্য বা বৈষম্যের রগরগে প্রদর্শনী শিল্পের সম্মান ক্ষুণ্ন করেনি।
সহৃদয় এবং সম্পন্ন ঘরের ডাক্তার আইরিনের চরিত্রে সাফা কবির ভালো অভিনয় করেছেন। খানিক আদুরে, আহ্লাদী স্বভাবের আইরিনকে ফুটিয়ে তুলেছেন, সেই সঙ্গে সাবধানে অতিবিগলিত অভিনয় এড়িয়ে গিয়েছেন। মিঠুর চরিত্রে পার্থ শেখকে মানিয়েছে, অভিনয়ও ভালো করেছেন। স্বাভাবিক অভিব্যক্তি দিয়ে দর্শককে হাসানোর কঠিন কাজটি ইনি পারেন। আর এ কে আজাদ সেতু চা-বাগানের ম্যানেজার হিসেবে অনায়াসে পুরোনো মূল্যবোধের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছেন।
ডাক্তার আইরিনের চরিত্রে সাফা কবির ভালো অভিনয় করেছেনঅভিজ্ঞ শিল্পীদের কাছে অভিনয়ের এই মান প্রত্যাশিতই ছিল। অভিনয়ে সত্যিকারভাবে মুগ্ধ করেছেন সারাহ জেবীন আর রেজওয়ান পারভেজ। সারাহ জেবীনের পর্দা-উপস্থিতি যেমন উজ্জ্বল, তেমন স্বচ্ছন্দে তিনি অভিনয় করেছেন। কথায়, চোখ আর শরীরের ভাষায় চা-বাগানের মেয়ে নন্দিনীকে জীবন্ত করে তুলেছেন। রবিনের চরিত্রে রেজওয়ান পারভেজও দারুণ সাবলীল। একদিকে সরলতা, আরেক দিকে গভীর দার্শনিক উপলব্ধির প্রকাশ—দুটিই ভালো সামলেছেন। সারাহ জেবীন, রেজওয়ান পারভেজ আর বিশেষ চরিত্রে পূর্ণিমা বৃষ্টিকে কাস্ট করার জন্য সৌরভ কর্মকার পুরো নম্বর পাবেন।
ডাক্তার আইরিনের চরিত্রে সাফা কবির ভালো অভিনয় করেছেন। খানিক আদুরে, আহ্লাদী স্বভাবের আইরিনকে ফুটিয়ে তুলেছেন, সেই সঙ্গে সাবধানে অতিবিগলিত অভিনয় এড়িয়ে গিয়েছেন। মিঠুর চরিত্রে পার্থ শেখকে মানিয়েছে, অভিনয়ও ভালো করেছেন।
মারিয়া হক সরকার পোশাক পরিকল্পনায় খুব ভালো কাজ করেছেন, তাঁর পোশাকে সাফা, সারাহ জেবীন আর রেজওয়ান পারভেজকে দারুণ মানিয়েছে। তবে ‘রিচ-কিড’ হিসেবে পার্থ শেখের গায়ে আরও দামি, ব্র্যান্ডেড কাপড় থাকলে ভালো হতো। রূপসজ্জায় আতিয়া রহমান খুবই সফল—সব চরিত্রকেই পরিবেশ ও ব্যক্তিত্ব অনুযায়ী সাজিয়েছেন।
রুসলান রেহমানের সংগীত আর শৈব তালুকদারের সাউন্ড মিক্সিং উঁচু মানের। সালেহ সোবহানের সম্পাদনা যেমন যথাযথ, কালারিস্ট উম্মিদ আশরাফের কাজও তেমন নজরকাড়া। এঁরা সবাই মিলে চা-বাগানের ঝকঝকে রোদমাখা দিন আর শিয়ালডাকা মিশকালো রাতের অনুভূতিকে জীবন্ত করে তুলতে পেরেছেন।
ডাক্তার আইরিন যখন জেনে অবাক হন, চা-বাগানে আসা তিনিই প্রথম ডাক্তার—সে দৃশ্যে হাসতে গিয়েও চা-বাগানের মানুষদের অপ্রাপ্তির কথা ভেবে বুকের ভেতরটা খচখচ করে। রবিন যখন বলেন, চা–বাগানে চা–গাছকে বড় হতে দেওয়া হয় না, নিজেদের সুবিধার জন্য তাকে কেটে ছোট করে রাখা হয়, সে কথাটিও মনে গেঁথে যায়। শুধু চা–বাগানে নয়, সারা দেশেই বড় যা কিছু সম্ভাবনা, তাকে চাপিয়ে, ছোট করে দিয়ে আমাদের মনের প্রাচীর এই জাতিকে খর্ব-ক্ষুদ্র করে রেখেছে। এমন মনে ঘা-দেওয়া দৃশ্য এবং সংলাপ এই সিনেমায় আরও বেশ কিছু আছে।
বহু ব্যক্তি ও সংস্থার সম্মিলিত উদ্যোগ না থাকলে বাংলাদেশের সিনেমাকেও চা-গাছের মতো ছোট হয়েই থাকতে হবে। তেত্রিশের পয়লা বৈশাখে শঙ্খ দাশগুপ্ত চমৎকার হালখাতা খুললেন, তাঁকে অভিনন্দন।‘চা গরম’–এর দৃশ্য। চরকির সৌজন্যে
‘চা-গরম’ প্রযোজনার জন্য চরকি ও অক্সফ্যামকে ধন্যবাদ জানাই। যাদের কথা কেউ বলে না, সিনেমায় তাদের কথা বলার জন্য পয়সা ও প্রতিভা বিনিয়োগের গুরুদায়িত্বটি তারা পালন করেছে। সহায়তার জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন, রবি এবং রিভাইভ টি-কেও ধন্যবাদ। বহু ব্যক্তি ও সংস্থার সম্মিলিত উদ্যোগ না থাকলে বাংলাদেশের সিনেমাকেও চা-গাছের মতো ছোট হয়েই থাকতে হবে। তেত্রিশের পয়লা বৈশাখে শঙ্খ দাশগুপ্ত চমৎকার হালখাতা খুললেন, তাঁকে অভিনন্দন। অতীতে মানুষ এলাকাবন্ধন করত অন্ধবিশ্বাস দিয়ে। আজকের যুগে নিজেদের লোকালয় আর সন্তানকে রক্ষা করতে হয় উন্নত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে, সব মানুষের সুযোগ নিশ্চিত করে। সিনেমা-মাধ্যমে এই সরল অথচ গুরুত্বপূর্ণ সত্যটির শৈল্পিক বয়ান সামনে আসার দরকার ছিল।
